বগুড়া ১২:৪৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৮ কোটি টাকা বিতরণে খরচ ৫৩ কোটি!

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঘরবাড়ি হারানো অসহায় মানুষের সহায়তার জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তরের একটি প্রকল্প প্রস্তাবকে ঘিরে উঠেছে ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন। প্রকল্পে ৩০০ জন বাস্তুচ্যুত ও অসহায় মানুষকে প্রায় ৮ কোটি টাকার অনুদান দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও, সেই অর্থ বিতরণে প্রশাসনিক ও পরামর্শক খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৩ কোটিরও বেশি।

 

প্রকল্প প্রস্তাবনা অনুযায়ী, ‘অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের নগর একীভূতকরণ সক্ষমতা শক্তিশালীকরণ এবং স্বাগতিক সম্প্রদায়কে সহায়তা প্রদান (ইন্টিগ্রেট)’ শীর্ষক প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬১ কোটি ২৯ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। জার্মান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জিআইজেড)-এর অর্থায়নে এক বছর নয় মাস মেয়াদে এটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ বিষয়ে রোববার পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

 

প্রকল্পটির লক্ষ্য খুলনা, সাতক্ষীরা, রাজশাহী ও সিরাজগঞ্জে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। এর আওতায় ৩০০ জনকে ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য আর্থিক সহায়তা এবং দেড় হাজার মানুষের জীবিকা উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

 

তবে বাজেট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট বরাদ্দের মাত্র ৮ কোটি ১০ লাখ ৯০ হাজার টাকা সরাসরি উপকারভোগীদের অনুদান হিসেবে দেওয়া হবে, যা মোট বাজেটের ১৩ দশমিক ২৩ শতাংশ। বাকি ৫৩ কোটি ১৮ লাখ ৭৪ হাজার টাকা ব্যয় হবে ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক কার্যক্রম, অফিস পরিচালনা এবং অন্যান্য খাতে।

 

প্রকল্পের নথিতে দেখা যায়, মাত্র ৩০০ জন উপকারভোগীর জন্য ৪৭৩ জন দেশি-বিদেশি পরামর্শক নিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে। তাদের পেছনেই ব্যয় ধরা হয়েছে ২৯ কোটি ৬২ লাখ ৬৩ হাজার টাকা, যা মোট প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় ৪৮ শতাংশ।

 

এছাড়া কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ ও প্রশিক্ষণের জন্য ৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা এবং অভ্যন্তরীণ ভ্রমণের জন্য ১ কোটি ২৭ লাখ ৭৬ হাজার টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। ব্যবস্থাপনা চার্জ হিসেবে রাখা হয়েছে ১০ কোটি ৭ লাখ ৬৫ হাজার টাকা এবং অফিস ভাড়ার জন্য ৩ কোটি ১৯ লাখ ২৫ হাজার টাকা। এছাড়া আইটি সরঞ্জাম, টেলিযোগাযোগ, প্রশিক্ষণ, কর্মশালা, ইউটিলিটি বিল, পরিবহন ও অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যয়ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রকল্পে উপকারভোগী বাছাইয়ের পদ্ধতি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। একই সঙ্গে সরকারি ক্রয় আইন (পিপিএ-২০০৬) ও সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর-২০০৮) যথাযথভাবে অনুসরণ না করার অভিযোগও রয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদের একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে অতিক্রান্ত হওয়ায় বাস্তবায়ন নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

 

পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পিইসি সভায় পরামর্শক নিয়োগ, বিদেশ ভ্রমণ, অফিস ভাড়া ও অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। অতিরিক্ত ব্যয়ের খাতগুলো পুনর্বিবেচনারও সুপারিশ করা হতে পারে।

 

পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য উপকারভোগীদের ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়া এবং তাদের জীবনমান উন্নয়ন করা। অথচ বাজেটের বড় অংশ প্রশাসনিক ও পরামর্শক ব্যয়ে বরাদ্দ করা হয়েছে। তাই প্রকল্পটি বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হবে।

 

এ বিষয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অধিশাখা) মো. সাজ্জাদুল ইসলাম বলেন, এটি একটি কারিগরি সহায়তা প্রকল্প। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)-এর মাধ্যমে দাতা সংস্থা জিআইজেডের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে এবং প্রকল্পের প্রস্তাবনাও তাদের শর্ত অনুযায়ী তৈরি করা হয়েছে।

 

তিনি বলেন, অনুদানের অর্থ হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে দাতা সংস্থার নির্ধারিত কাঠামোর বাইরে যাওয়ার সুযোগ থাকে না। বিদেশ ভ্রমণের বিষয়টি কেবল প্রস্তাবনায় রয়েছে। সরকার অনুমোদন দিলে তবেই তা বাস্তবায়ন হবে, অন্যথায় ওই অর্থ ব্যয় হবে না। অফিস ভাড়ার বিষয়টিও প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তার অংশ হিসেবে রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি।

 

তথ্যসূত্র: কালবেলা

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

ভাইরাল

ভুল সংবাদ ছড়ানো শীর্ষ ৭ সংবাদমাধ্যম, রিউমর স্ক্যানারের পরিসংখ্যান প্রকাশ

৮ কোটি টাকা বিতরণে খরচ ৫৩ কোটি!

পাবলিশ টাইম : ১২:৫০:৩৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঘরবাড়ি হারানো অসহায় মানুষের সহায়তার জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তরের একটি প্রকল্প প্রস্তাবকে ঘিরে উঠেছে ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন। প্রকল্পে ৩০০ জন বাস্তুচ্যুত ও অসহায় মানুষকে প্রায় ৮ কোটি টাকার অনুদান দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও, সেই অর্থ বিতরণে প্রশাসনিক ও পরামর্শক খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৩ কোটিরও বেশি।

 

প্রকল্প প্রস্তাবনা অনুযায়ী, ‘অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের নগর একীভূতকরণ সক্ষমতা শক্তিশালীকরণ এবং স্বাগতিক সম্প্রদায়কে সহায়তা প্রদান (ইন্টিগ্রেট)’ শীর্ষক প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬১ কোটি ২৯ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। জার্মান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জিআইজেড)-এর অর্থায়নে এক বছর নয় মাস মেয়াদে এটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ বিষয়ে রোববার পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

 

প্রকল্পটির লক্ষ্য খুলনা, সাতক্ষীরা, রাজশাহী ও সিরাজগঞ্জে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। এর আওতায় ৩০০ জনকে ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য আর্থিক সহায়তা এবং দেড় হাজার মানুষের জীবিকা উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

 

তবে বাজেট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট বরাদ্দের মাত্র ৮ কোটি ১০ লাখ ৯০ হাজার টাকা সরাসরি উপকারভোগীদের অনুদান হিসেবে দেওয়া হবে, যা মোট বাজেটের ১৩ দশমিক ২৩ শতাংশ। বাকি ৫৩ কোটি ১৮ লাখ ৭৪ হাজার টাকা ব্যয় হবে ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক কার্যক্রম, অফিস পরিচালনা এবং অন্যান্য খাতে।

 

প্রকল্পের নথিতে দেখা যায়, মাত্র ৩০০ জন উপকারভোগীর জন্য ৪৭৩ জন দেশি-বিদেশি পরামর্শক নিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে। তাদের পেছনেই ব্যয় ধরা হয়েছে ২৯ কোটি ৬২ লাখ ৬৩ হাজার টাকা, যা মোট প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় ৪৮ শতাংশ।

 

এছাড়া কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ ও প্রশিক্ষণের জন্য ৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা এবং অভ্যন্তরীণ ভ্রমণের জন্য ১ কোটি ২৭ লাখ ৭৬ হাজার টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। ব্যবস্থাপনা চার্জ হিসেবে রাখা হয়েছে ১০ কোটি ৭ লাখ ৬৫ হাজার টাকা এবং অফিস ভাড়ার জন্য ৩ কোটি ১৯ লাখ ২৫ হাজার টাকা। এছাড়া আইটি সরঞ্জাম, টেলিযোগাযোগ, প্রশিক্ষণ, কর্মশালা, ইউটিলিটি বিল, পরিবহন ও অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যয়ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রকল্পে উপকারভোগী বাছাইয়ের পদ্ধতি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। একই সঙ্গে সরকারি ক্রয় আইন (পিপিএ-২০০৬) ও সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর-২০০৮) যথাযথভাবে অনুসরণ না করার অভিযোগও রয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদের একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে অতিক্রান্ত হওয়ায় বাস্তবায়ন নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

 

পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পিইসি সভায় পরামর্শক নিয়োগ, বিদেশ ভ্রমণ, অফিস ভাড়া ও অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। অতিরিক্ত ব্যয়ের খাতগুলো পুনর্বিবেচনারও সুপারিশ করা হতে পারে।

 

পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য উপকারভোগীদের ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়া এবং তাদের জীবনমান উন্নয়ন করা। অথচ বাজেটের বড় অংশ প্রশাসনিক ও পরামর্শক ব্যয়ে বরাদ্দ করা হয়েছে। তাই প্রকল্পটি বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হবে।

 

এ বিষয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অধিশাখা) মো. সাজ্জাদুল ইসলাম বলেন, এটি একটি কারিগরি সহায়তা প্রকল্প। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)-এর মাধ্যমে দাতা সংস্থা জিআইজেডের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে এবং প্রকল্পের প্রস্তাবনাও তাদের শর্ত অনুযায়ী তৈরি করা হয়েছে।

 

তিনি বলেন, অনুদানের অর্থ হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে দাতা সংস্থার নির্ধারিত কাঠামোর বাইরে যাওয়ার সুযোগ থাকে না। বিদেশ ভ্রমণের বিষয়টি কেবল প্রস্তাবনায় রয়েছে। সরকার অনুমোদন দিলে তবেই তা বাস্তবায়ন হবে, অন্যথায় ওই অর্থ ব্যয় হবে না। অফিস ভাড়ার বিষয়টিও প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তার অংশ হিসেবে রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি।

 

তথ্যসূত্র: কালবেলা