বগুড়া ০৪:০২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

২০ বছরেও চালু হয়নি সান্তাহার হাসপাতাল, চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত প্রায় ৪ লাখ মানুষ

বগুড়ার আদমদিঘী উপজেলার সান্তাহারে প্রায় ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ২০ শয্যার হাসপাতালটি উদ্বোধনের প্রায় দুই দশক পেরিয়ে গেলেও এখনো চালু হয়নি ইনডোর চিকিৎসাসেবা।

 

নারী ও পুরুষের জন্য পৃথক ১০ শয্যার দুটি ওয়ার্ড এবং অপারেশন সুবিধাসহ আধুনিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে ২০০৬ সালে হাসপাতালটি উদ্বোধন করা হলেও আজও তা পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি। ফলে বগুড়া ও নওগাঁ জেলার প্রায় ৪ লাখ মানুষ কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন।

 

উদ্বোধনের পর থেকেই স্থানীয়রা বিভিন্ন সময়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর দাবি জানিয়ে আসছেন। তবে দীর্ঘ সময়েও কার্যকর কোনো উদ্যোগ বাস্তবায়ন হয়নি।

 

বর্তমানে হাসপাতালটিতে প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত মাত্র চার ঘণ্টা বহির্বিভাগে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অধিকাংশ রোগী জ্বর, সর্দি-কাশি ও ব্যথার সাধারণ ওষুধ ছাড়া তেমন কোনো চিকিৎসাসেবা পান না। তবে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার মাধ্যমে হাসপাতালটিতে যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

 

সরেজমিনে দেখা গেছে, নারী ও পুরুষের দুটি ওয়ার্ডই তালাবদ্ধ। একই অবস্থা অপারেশন থিয়েটারেরও। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নির্মিত আবাসিক ভবনগুলো দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। হাসপাতালের বারান্দায় জমেছে বালুর স্তর, চারপাশের পরিবেশও জরাজীর্ণ। অপারেশন ইউনিটের জন্য বরাদ্দকৃত যন্ত্রপাতিও এখনো স্থাপন করা হয়নি।

 

সান্তাহারের দমদমা এলাকার বাসিন্দা মো. খায়রুল ইসলাম বলেন, “এই হাসপাতাল থেকে কার্যত কোনো চিকিৎসাসেবা পাওয়া যায় না। বছরের পর বছর হাসপাতালটি পড়ে থাকলেও চিকিৎসকের সংকট কাটেনি। বহির্বিভাগে কিছু সাধারণ ওষুধ দেওয়া হয়। একজন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট আছেন, তিনি যক্ষ্মা প্রতিরোধ কর্মসূচির আওতায় কাজ করেন। এলাকায় বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে চিকিৎসার জন্য বগুড়া শহরে ছুটতে হয়। অথচ এত বড় একটি হাসপাতাল থাকা সত্ত্বেও কয়েক লাখ মানুষ স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত।”

 

রথবাড়ী এলাকার মো. হাফিজার রহমান বলেন, “যেকোনো ধরনের চিকিৎসার জন্য বগুড়া, নওগাঁ কিংবা রাজশাহীতে যেতে হয়। সরকারের নির্মিত হাসপাতাল থাকলেও সেখানে চিকিৎসক নেই। বহির্বিভাগ চালুর পরই যদি ইনডোর সেবা চালু করা হতো, তাহলে এলাকার মানুষ অনেক উপকৃত হতেন।”

 

এ বিষয়ে আদমদিঘী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. ফজলে রাব্বির সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

 

জানা গেছে, হাসপাতালটিতে অনুমোদিত ২৩টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ১৩ জন। ইনডোর চিকিৎসাসেবা চালু করতে আরও ২০টি নতুন পদ সৃষ্টির প্রস্তাব কয়েক মাস আগে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকা ১০টি পদ পূরণের বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।

 

এদিকে অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালের জন্য বরাদ্দ দেওয়া চিকিৎসা যন্ত্রপাতি বর্তমানে বগুড়ার মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে সংরক্ষিত রয়েছে। তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মজিদুল ইসলাম বলেন, সান্তাহার হাসপাতালের যন্ত্রপাতি সেখানে সংরক্ষিত আছে কি না, তা তাঁর জানা নেই।

 

স্থানীয়দের দাবি, হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে বগুড়া ও নওগাঁ জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমবে এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা দ্রুত নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

 

বগুড়ার সিভিল সার্জন মো. খুরশীদ আলম বলেন, বর্তমানে হাসপাতালটিতে বহির্বিভাগ চালু থাকলেও ইনডোর সেবা চালু করা সম্ভব হয়নি। এর কারণ হিসেবে তিনি জানান, হাসপাতালের বিভিন্ন অবকাঠামো নষ্ট হয়ে গেছে এবং ইনডোর সেবা চালুর জন্য প্রয়োজনীয় জনবলও নেই।

 

তিনি বলেন, “প্রয়োজনীয় সংস্কার ও জনবল নিয়োগের জন্য ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করে যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর লক্ষ্যে কাজ চলছে।”

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

ভাইরাল

ভুল সংবাদ ছড়ানো শীর্ষ ৭ সংবাদমাধ্যম, রিউমর স্ক্যানারের পরিসংখ্যান প্রকাশ

২০ বছরেও চালু হয়নি সান্তাহার হাসপাতাল, চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত প্রায় ৪ লাখ মানুষ

পাবলিশ টাইম : ০৪:২২:৩৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬

বগুড়ার আদমদিঘী উপজেলার সান্তাহারে প্রায় ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ২০ শয্যার হাসপাতালটি উদ্বোধনের প্রায় দুই দশক পেরিয়ে গেলেও এখনো চালু হয়নি ইনডোর চিকিৎসাসেবা।

 

নারী ও পুরুষের জন্য পৃথক ১০ শয্যার দুটি ওয়ার্ড এবং অপারেশন সুবিধাসহ আধুনিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে ২০০৬ সালে হাসপাতালটি উদ্বোধন করা হলেও আজও তা পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি। ফলে বগুড়া ও নওগাঁ জেলার প্রায় ৪ লাখ মানুষ কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন।

 

উদ্বোধনের পর থেকেই স্থানীয়রা বিভিন্ন সময়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর দাবি জানিয়ে আসছেন। তবে দীর্ঘ সময়েও কার্যকর কোনো উদ্যোগ বাস্তবায়ন হয়নি।

 

বর্তমানে হাসপাতালটিতে প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত মাত্র চার ঘণ্টা বহির্বিভাগে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অধিকাংশ রোগী জ্বর, সর্দি-কাশি ও ব্যথার সাধারণ ওষুধ ছাড়া তেমন কোনো চিকিৎসাসেবা পান না। তবে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার মাধ্যমে হাসপাতালটিতে যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

 

সরেজমিনে দেখা গেছে, নারী ও পুরুষের দুটি ওয়ার্ডই তালাবদ্ধ। একই অবস্থা অপারেশন থিয়েটারেরও। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নির্মিত আবাসিক ভবনগুলো দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। হাসপাতালের বারান্দায় জমেছে বালুর স্তর, চারপাশের পরিবেশও জরাজীর্ণ। অপারেশন ইউনিটের জন্য বরাদ্দকৃত যন্ত্রপাতিও এখনো স্থাপন করা হয়নি।

 

সান্তাহারের দমদমা এলাকার বাসিন্দা মো. খায়রুল ইসলাম বলেন, “এই হাসপাতাল থেকে কার্যত কোনো চিকিৎসাসেবা পাওয়া যায় না। বছরের পর বছর হাসপাতালটি পড়ে থাকলেও চিকিৎসকের সংকট কাটেনি। বহির্বিভাগে কিছু সাধারণ ওষুধ দেওয়া হয়। একজন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট আছেন, তিনি যক্ষ্মা প্রতিরোধ কর্মসূচির আওতায় কাজ করেন। এলাকায় বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে চিকিৎসার জন্য বগুড়া শহরে ছুটতে হয়। অথচ এত বড় একটি হাসপাতাল থাকা সত্ত্বেও কয়েক লাখ মানুষ স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত।”

 

রথবাড়ী এলাকার মো. হাফিজার রহমান বলেন, “যেকোনো ধরনের চিকিৎসার জন্য বগুড়া, নওগাঁ কিংবা রাজশাহীতে যেতে হয়। সরকারের নির্মিত হাসপাতাল থাকলেও সেখানে চিকিৎসক নেই। বহির্বিভাগ চালুর পরই যদি ইনডোর সেবা চালু করা হতো, তাহলে এলাকার মানুষ অনেক উপকৃত হতেন।”

 

এ বিষয়ে আদমদিঘী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. ফজলে রাব্বির সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

 

জানা গেছে, হাসপাতালটিতে অনুমোদিত ২৩টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ১৩ জন। ইনডোর চিকিৎসাসেবা চালু করতে আরও ২০টি নতুন পদ সৃষ্টির প্রস্তাব কয়েক মাস আগে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকা ১০টি পদ পূরণের বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।

 

এদিকে অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালের জন্য বরাদ্দ দেওয়া চিকিৎসা যন্ত্রপাতি বর্তমানে বগুড়ার মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে সংরক্ষিত রয়েছে। তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মজিদুল ইসলাম বলেন, সান্তাহার হাসপাতালের যন্ত্রপাতি সেখানে সংরক্ষিত আছে কি না, তা তাঁর জানা নেই।

 

স্থানীয়দের দাবি, হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে বগুড়া ও নওগাঁ জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমবে এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা দ্রুত নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

 

বগুড়ার সিভিল সার্জন মো. খুরশীদ আলম বলেন, বর্তমানে হাসপাতালটিতে বহির্বিভাগ চালু থাকলেও ইনডোর সেবা চালু করা সম্ভব হয়নি। এর কারণ হিসেবে তিনি জানান, হাসপাতালের বিভিন্ন অবকাঠামো নষ্ট হয়ে গেছে এবং ইনডোর সেবা চালুর জন্য প্রয়োজনীয় জনবলও নেই।

 

তিনি বলেন, “প্রয়োজনীয় সংস্কার ও জনবল নিয়োগের জন্য ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করে যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর লক্ষ্যে কাজ চলছে।”