রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনার পর আবারও আলোচনায় এসেছে দেশের আলোচিত ‘সিরিয়াল কিলার’ রসু খাঁর নাম। একের পর এক ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হলেও দীর্ঘ ১১ বছরেও তার বিচার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ না হওয়ায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে।
রসু খাঁর বিরুদ্ধে ১১ নারীকে ধর্ষণের পর হত্যা করার অভিযোগ রয়েছে। ২০১৫ সালে একটি মামলায় নিম্ন আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরে ২০২৪ সালে হাইকোর্টও সেই রায় বহাল রাখেন। তবে এত বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো আপিল বিভাগের শুনানি শেষ হয়নি। ফলে কার্যকর হয়নি তার মৃত্যুদণ্ড।
সেই সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে রসু খাঁকে ‘সিরিয়াল কিলার’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। আদালত বলেন, তিনি কোনো ধরনের আইনি অনুকম্পা পাওয়ার যোগ্য নন এবং তার সর্বোচ্চ শাস্তিই প্রাপ্য। কিন্তু রায়ের প্রায় দুই বছর পরও আপিল শুনানি না হওয়ায় বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে হতাশা বাড়ছে।
চাঁদপুর সদর উপজেলার চান্দ্রা ইউনিয়নের মদনা গ্রামের মুন খাঁ ওরফে আবু খার ছেলে রসু খাঁ। ২০০৯ সালের ৭ অক্টোবর টঙ্গীতে একটি মসজিদের ফ্যান চুরির ঘটনায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তার মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে স্থানীয় এক কিশোরী হত্যার ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে পুলিশ।
রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে বেরিয়ে আসে ভয়ংকর সব তথ্য। আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে রসু খাঁ ১১টি ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন বলে জানা যায়।
রসু খাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোর মধ্যে প্রথম মৃত্যুদণ্ডের রায় আসে ২০১৫ সালের ২২ এপ্রিল। খুলনার পোশাককর্মী শাহিদা হত্যা মামলায় চাঁদপুরের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ অরুণাভ চক্রবর্তী তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন।
এরপর ২০০৯ সালের ২০ জুলাই ফরিদগঞ্জ উপজেলার মধ্য হাঁসা গ্রামের নির্জন মাঠে পারভীন আক্তার নামে এক নারীকে ধর্ষণ ও শ্বাসরোধে হত্যার মামলায় ২০১৮ সালের ৬ মার্চ রসু খাঁ, তার ভাগনে জহিরুল ইসলামসহ তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল।
আইন অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির ফাঁসি কার্যকর করতে হলে নিম্ন আদালত ও হাইকোর্টের রায়ের পর আপিল বিভাগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হয়। এরপরও রিভিউ আবেদন করার সুযোগ থাকে।
আইনজীবী মনজিল মোরসেদ গণমাধ্যমকে বলেন, আপিল শুনানির জন্য মামলার ‘পেপারবুক’ প্রস্তুত করতে হয়। এই প্রক্রিয়ায় অনেক সময় দীর্ঘ বিলম্ব ঘটে। কখনো কখনো ১০ বছরও লেগে যায়। আর এই পেপারবুক প্রস্তুতের দায়িত্ব সরকারের।
এদিকে রসু খাঁর বিরুদ্ধে আরও একটি হত্যা মামলায় নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ডের রায় হলেও সেটির আপিল শুনানি এখনো হয়নি।
রামিসা হত্যাকাণ্ডের পর বিচার ব্যবস্থার ধীরগতির বিষয়টি আবার সামনে এসেছে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ এক গবেষণায় দেখা গেছে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বিধান থাকলেও বাস্তবে একটি মামলা শেষ হতে গড়ে তিন বছর সাত মাস সময় লাগছে। অনেক ক্ষেত্রে এই সময় আরও দীর্ঘ হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচার প্রক্রিয়ার এমন দীর্ঘসূত্রিতা ভুক্তভোগী পরিবারের মধ্যে হতাশা ও অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। একই সঙ্গে অপরাধ দমনে বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।